1. admin@bhorerkhariya.com : Admin :
  2. bhorerkharia@gmail.com : admin : admin
  3. mainulislammohin65@gmail.com : Cumilla News : মোঃ মাইনুল ইসলাম মহিন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৩ অপরাহ্ন

স্মৃতিতে একাত্তর 

রিপোর্টার
  • পোষ্ট হয়েছে শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৩
  • ১৫৭ বার দেখেছে
  • ই-পেপার দেখুন
লেখক: পংকজ পাল
সেদিন রোববার সকালের সোনালী রোদের চাদরে দিগন্ত ছুঁয়েছে। চারদিক থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে।হঠাৎ তিনটি গুলির শব্দে যেন সবকিছু নিরব হয়ে গেল।। রাস্তা দিয়ে লোকজন দৌড়াদৌড়ি করছে। সবাই বলাবলি করছে পাকবাহিনী এসেছে। আমরা বাবা-মার সাথে দৌড়ায়ে পাশের গ্রামে আশ্রয় নিলাম। ওখানে কিছুদিন থাকার পর সেখান থেকে তিন মাইল ভিতরে বাইশকাইল গ্রামে পাটিয়াপাড়ায় আশ্রয় নিলাম। কয়েকদিন ওখানে থাকার পর একদিন খবর এলো  আগামীকাল এখানে পাকবাহিনীরা হানা দিবে।আমরা রাতেই নৌকায় অন্য জায়গায় যাওয়ার উদ্দেশে রওনা দিলাম। পথিমধ্যে বনমালী গ্রামের একটি স্কুলের কাছে নৌকা ভিড়ায়ে রান্নার কাজ চলছে। এরই মধ্যে একজন ভদ্রলোক এসে খবর দিলেন পাক বাহিনী আসতেছে।নৌকার মাঝি কাল বিলম্ব না করে নৌকা ছেড়ে দিলেন।  আমরা নৌকায় ঝিনাইনদীর ওপারে ঝাওয়াইল নামক গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। পরেরদিন খবর এলো পাটিয়াপাড়া  থেকে পাকবাহিনীরা ২০/২২ জন হিন্দু নিরীহ লোকদের  ধরে নিয়ে একসাথে বেঁধে গুলি করে হত্যা করেছে। কী নৃশংসতা!ওনারা কেউ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। নীরিহ গ্রামবাসী।  বাড়িতে ঢুকে ঢুকে হিন্দু হওয়ার দরুন তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।যুদ্ধের ময়দানে এক যোদ্ধা অন্য যোদ্ধাকে হত্যা করতেই পারে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী আত্মসমর্পণ করলে যোদ্ধাকেও হত্যা করার নিয়ম নেই। কিন্তু কুখ্যাত পাকবাহিনী যুদ্ধের কোনো নিয়মনীতিই মানতো না।
একদিন সকালে দেখি আমার দুই কাকা মাথায় কিছু নিয়ে ঝাউয়াইল এসে হাজির হলো। বাড়ির ভিতরে ঢুকেই হাউমাউ করে দু’জনে কাঁদতে কাঁদতে বললে  বাবাকে কাল ধরে নিয়ে সন্ধ্যায় গুলি করে হত্যা করেছে। এই কথা শোনা মাত্রই বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। আমার দাদু ছিলেন খুব জনপ্রিয় ব্যাক্তি ৩২ বছর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন। ভালো লোক হিসেবে তাঁর ব্যাপক সুনাম ছিল। আমরা যখন নিজ বাড়ি ছেড়ে চলে এলাম তখন আমার ঠাকুরদাদা  বলেছিলেন আমার কোন শত্রু নেই। আমাকে কেউ মারবে না। বাবারই এক বন্ধু নাম গুলু সেখ সেই  কয়েকজন পাক সৈন্য সাথে নিয়ে আমার ঠাকুরদাদাকে তুলে নিয়ে ওদের ক্যাম্পের কাছে নদীর ধারে হত্যা করেছে।
 মুক্তি যোদ্ধাদের আধুনিক অস্ত্র না থাকার দরুন  বিনা বাঁধায় পাকবাহিনীরা রাজাকারদের প্ররোচনায়  বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও নীরিহ হিন্দুদের হত্যা করতো।
কয়েকদিন যেতে না যেতেই খবর এলো ঝিনাই নদর ওপারে পাকবাহিনী জড়ো হচ্ছে ঝাওয়াইল বাজারে আসার জন্য। আমরা তড়িঘড়ি করে হেঁটে চললাম অজানার উদ্দেশ্যে। কাদেরিয়া বাহিনীর যোদ্ধারাও তাদের আগমন ঠেকাতে নদীর এপার থেকে গুলি ছুঁড়ছে। উভয়পক্ষের মধ্যে টানা দুইদিন গোলাগুলির পর মুক্তিযোদ্ধারা গুলির অভাবে পিছু হটতে বাধ্য হলো। গোলাগুলির মধ্যেই আমরা মোয়াইল গ্রামে গাদু সেখের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। আমরা ঝাওয়াইল যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম সেটা পাকবাহিনী পুড়িয়ে দিয়েছে।  বাবা ভাবলেন এভাবে আর কয়দিন পালায়ে বেড়াবো। পার্শ্ববর্তী দেশে হয়তো একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাওয়া যাবে। আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে সীমান্ত অনেক দূরে। স্থল পথে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন নৌকায় যনুনা নদী হয়ে ভারতে প্রবেশ করবো। গুটিকয়েক লোক রাজাকার থাকলেও বেশিরভাগ লোকই আমাদের সহযোগিতা করেছে।
  খোঁজখবর নিয়ে একটি বড় নৌকা ভাড়া নেওয়া হলো। নৌকাটি সোনামই ঘাটে আছে। টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যেই আমরা একটি ছোট নৌকায়  মোয়াইল থেকে সোনামই ঘাটে গিয়ে বড় নৌকায় উঠলাম।  নৌকায় ৪ জন মাঝি মাল্লা। দুইটি নৌকা একসঙ্গে ছেড়ে দিলো।  তখন বর্ষার সময়।  বিশাল যমুনা এই প্রথম দেখলাম।  উজানে দিকে যেতে হবে তাই নৌকা এগুতে চায় না। বাতাস না থাকলে বাদামে নৌকা চলে না।  তাই মাঝে মাঝে দুইজন মাল্লা রশি দিয়ে নৌকা টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরই দেখলাম একটি লাশ ভেসে যাচ্ছে।  নৌকার মাঝি বললেন,গতকালকে একটি শরনার্থী নৌকা পাকবাহীনিরা জগন্নাথগঞ্জ ঘাট থেকে সিরাজগঞ্জ যাওয়ার সময় স্টীমার থেকে গুলি করে ডুবিয়ে দিয়েছে। বলতে বলতে আমরা জগন্নাথগঞ্জ ঘাট পাড়ি দিলাম। একরাত পর আমরা বাহাদুরাবাদ ঘাটের কাছে চলে এলাম। নৌকার মাঝি বললেন এই ঘাট পাড় হলেই বড় বিপদ কেটে যাবে। বাহাদুরাবাদ ঘাটের কাছাকাছি আসতেই দূরে স্টীমার দেখতে পেলাম। সবাই ভয়ে আঁতকে উঠলো। এবার বুঝি জীবনটা যায়। মাঝি সবাইকে কোন শব্দ না করে নৌকার পাটাতনের নীচে যেতে বললেন। পাটাতনের নীচ থেকে নদীর কিছু দেখা যায় না। সবাই মনেমনে স্রষ্টার নাম নিতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর মাঝি বললেন ভয় কেটে গেছে বেড়িয়ে আসেন। আমরা নৌকা থেকে বেড়িয়ে এলাম। দুইটি নৌকা একসাথে ঘাট থেকে ছেড়েছিল। প্রকৃতির কাজ সারতে দিনে দুইবার চরে নৌকা দুটি একসাথে নঙ্গর করে। এবারও নৌকা নঙ্গর করলো। অন্য নৌকা থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। নৌকা থেকে নেমে শুনলাম বাহাদুরাবাদ ঘাটে যখন স্টীমারের দেখা পেলাম তখন পাটাতনের নীচে মায়ের কোলে একটি ছোট্ট শিশু জোরে কাঁদছিল। মা ভয়ে শিশুটির মুখ কাপড় দিয়ে চেপে ধরেছিল যাতে কান্নার আওয়াজ বাহিরে না যায়। পাটাতনের নীচ থেকে বেড় হয়ে দেখে শিশুটি মারা গেছে। কী মর্মান্তিক! সবাই শিশুটির জন্য কাঁদছে। আমাদের নৌকার লোকজনের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করার পর ওকে যমুনার চরেই সমাহিত করে নৌকা আপন গতিতে ছুটে চললো।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2022 bhorerkhariya.com
Theme Customized BY Themes Seller